| |

স্মৃতির পূজো: যা পেয়েছি

“যা পেয়েছি প্রথম দিনে তাই যেন পাই শেষে” — এমনটাই আশা রাখি, কিন্তু বুঝি না, সময় কথা বলে। সময় চলেও খুব তাড়াতাড়ি, ফিরে আসে না — তবে স্মৃতিতে থেকে যায়। ‌আর স্মৃতি বড় আনন্দের, বড় বেদনারও। 

যেমন দুর্গাপুজোর আনন্দ। পূজা আসছে শুনলেই মনে হয় কী করব, কোথায় যাব — ভাবতে ভাবতে যেন আনন্দে থই পাওয়া যায় না। অথচ সেই ভাবনাটাই একদিন শেষ হয়ে যায়, রেখে যায় পরের বছরের পূজোর অপেক্ষা আর কিছু গভীর স্মৃতি। স্মৃতি সত্যিই কম আনন্দের নয়। ছোটবেলার পূজোর স্মৃতি আমরা সকলেই কিছু না কিছু বহন করে চলেছি। তখনকার পুজোর আনন্দটাই যেন ছিল অন্যরকম। ছোটবেলাতে আমরা পূজাতে যে ধূমধাম দেখেছি তা ভুলে যাবার নয়।

শরতের শিউলি ঝরা শান্ত ভোরে ঢাকের আওয়াজে প্রতিদিন সূর্যটাও যেন নতুন আর সুন্দর মনে হতো। আমাদের মতো ছোটদের জন্য পুজোর শুরু হতো “ষষ্ঠী পূজো”র ঢাকের শব্দে। তবে সে ঢাক বাজতে শুরু করত আরও আগে থেকেই। পুজো মণ্ডপ বাঁশ দিয়ে ঘেরা থাকত — যাতে কেউ মণ্ডপে ঢুকে না পড়ে বা প্রতিমা ছুঁয়ে না ফেলে। আমাদের সবচেয়ে বেশি কৌতূহল থাকত কলাবউকে নিয়ে — তখন তো “নবপত্রিকা” কী, তা বোঝার বয়স ছিল না। সকাল বেলাতে তাড়াতাড়ি করে স্নান সেরে নতুন জামাকাপড় পড়ে মন্ডপে যাওয়া নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়তাম। তবে এটাও ঠিক নতুন জামাকাপড় যে প্রয়োজন ছিল তা নয়, যা হয় একটা হলেই হলো। সন্ধ্যার আরতি ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। ছেলেরা ধুনুচি নিয়ে নাচত, ঢাকিরাও তালে তালে নেচে ঢাক বাজাত, সঙ্গে ছিল কাঁসরের ঝংকার। এখনকার মত বিরাট বিরাট বাজনার ব্যবস্থা ছিলনা। গ্রামের মানুষ অল্পে খুশী হত, সুখে থাকত। ‌এ আনন্দটা এখন তেমন করে পাই না। 

পূজায় আর ছিল মেলা। এখনকার মতো জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও সেখানে থাকত বেলুন, ঝুমঝুমি, বাঁশি, চুড়ি, আলতা, সিঁদুর — কত কী! মেলায় পাওয়া যেত বাদাম, নিমকি, জিলিপি, ফেনী-বাতাসা, মুড়কি… এখন সেসবের তেমন কদর নেই।  

তবে সবচেয়ে বেশী আকর্ষনীয় ছিল যাত্রা। আমরা  উন্মুখ হয়ে থাকতাম “নিমাই সন্যাস” যাত্রা দেখার জন্য, বুঝি বা না বুঝি, আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে থাকতাম। যাত্রার সাজ-পোশাক আর স্টেজে জগাই-মাধায়ের বোতল হাতে হুড়োহুড়ি, সবই ছিল আমাদের আনন্দের খোরাক। সবচেয়ে মজার, যখন আমাদের পাড়ার ছেলেরাই মেয়ে সেজে স্টেজে উঠতো, আমরা খুবই অবাক হতাম। ওরা যখন সাজতো, দেখার চেষ্টা করতাম, কিন্তু ওরা তাড়িয়ে দিতো। সারারাত জেগে যাত্রা দেখতাম, পরদিনও ক্লান্তি থাকত না — আবার দৌড়াদোড়ি বাঁধ ভাঙা আনন্দ, হৈচৈ, হাসি।

এখন সে সব কিছুই নেই, আছে সবকিছুতেই নিয়মের কড়াকড়ি, নতুন পোষাক, সুন্দর করে চলা-বলা, নেই স্বাধীনতা, সব আনন্দ উল্লাস গণ্ডীবদ্ধ। হাসিটাও যেন শৃঙ্খলিত — উচ্ছ্বাস কোথায় যেন চাপা পড়ে গেছে। তবু এ কথাও মানতে হবে — আছে আজ আলোর ঝলকানি, অর্কেস্ট্রা ব্যান্ড, নিত্য নতুন খাবার দাবার, আগে এমনটা ছিল না।  আমাদের হাসি, আনন্দ ছুটোছুটি, বাঁধ ভাঙা হৈচৈ এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না।  এখনকার ছোটদের মাঝে আমাদের ছোটবেলাকে খুঁজি, পাইনা। এখন এসেছে “বেগ” কেড়ে নিয়েছে “আবেগ“।

তাই বলি — “যা পেয়েছি প্রথম দিনে, তা আর পাব কি?”

হয়তো পেয়েছি, বেশিই পেয়েছি। আমার নাতনীর সুবাদে আলোয় ঝলমল স্বপ্নের আমেরিকার পূজার আনন্দ উৎসব। তবু কানের কাছে অলি যেন গুনগুন করে বলে, খোঁজ বন্ধুদের, ছোটবেলার বন্ধুদের, খুঁজি পাইনা, যদিও কাউকে পাই তারা এখন, অনেক দূরে তারার দেশে ধরা দেবে না। অনেককেই জানি না কোথায়? মনে মনে খুঁজি নাহ্ মেলাতে পারিনা।

তাই শেষমেষ বলি… – “খেলার সাথীরা কোথা আজ তারা, ভুলেও গিয়েছি নাম।“



স্বপ্না কর

স্বপ্না দেবী, জীবনের নানা ওঠা-পড়ার মাধ্যমে আজ এক পরিণত দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনকে দেখেন। তিনি ওহাইওতে নিজের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। আমাদের অনুরোধে তিনি কলম ধরলেন। বিদেশের মাটিতে শরতের হাওয়া, নাতনির কৌতূহলী চোখ, আর মনেপ্রাণে থাকা দুর্গাপুজোর গন্ধ — সব মিলিয়ে তাঁর মন ফিরে গেল বহু বছর আগের সেই শৈশবে, আমাদের উপহার দিয়ে গেলেন কিছু অমূল্য মুহূর্ত। এই ছোট গল্পে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর শৈশবের দুর্গাপূজা — কেমন ছিল সেই দিনগুলো, কীভাবে কাটতো প্রতিটি মুহূর্ত, আর কতটা আনন্দ থাকতো সবার মধ্যে। এই গল্প শুধু একটা সময়ের কথা নয়, বরং এক অনুভব, যা আজকের প্রজন্মের জন্য এক ঝলক অতীত।

ADVERTISEMENT
300 x 200 diff color
A11
ADVERTISEMENT
A7

Similar Posts

Leave a Reply