॥ মা আগমণী ॥
মা, ছোট্ট একটি ডাক | কিন্তু পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম আর্তি | চিরন্তন , বিশ্বজনীন | নিঃশর্ত, নিঃস্বার্থ স্নেহ-বাৎসল্যের এক অকৃত্রিম সংজ্ঞা | স্নেহময়ী মা-জননী একাধারে যেমন জন্মদাত্রী, সর্বংসহা,স্বয়ংসিদ্ধা, তেমনি দেবী, পালয়িত্রী,বিশ্বময়ী | দেবী দূর্গা তাই আপামর বাঙালীর জনমানসে মাতৃরূপেণ সংস্থিতাঃ | জ্যোতির্ময়ী,বিশ্বরূপা|
শ্রাবণসিক্ত প্রকৃতি যখন সতেজ,পল্লবিত , শুভ্র-স্বচ্ছ নীল আকাশ যখন ঝরে পড়া শিউলির বিনম্র সুবাসে মিঠে রোদ্ কে উষ্ণ আলিঙ্গন করে, ঠিক তখন-ই শরতের আকাশবীণায় বাজে ব্যাকুল রাগিনী – “আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও, জননী এসেছে দ্বারে” | বিশ্বময় বাঙালী উদ্বেলিত হয়ে ওঠে মাতৃ-আবাহনে | তাই দেশ থেকে সহস্র যোজন দূরে এই ক্লীভল্যান্ডে ও অনুরণিত হয় সেই গভীর ধ্বনি- “ত্বমেশ্বরী দেবী চরাচরস্য”| “তুমি-ই জগত-চরাচরের অধীশ্বরী” ,জগন্ময়ী,অপরূপা |
“ত্বং স্বহা, ত্বং স্বধা, ত্বং হি বসত্-করঃ সর্ব্ব-আত্মিকা
সুধা ত্বং অক্ষরনিত্যে ত্রিধামাত্রা আত্মিকা-স্থিতা”
মা এক নিগূঢ় অনুভূতির নৈস্বর্গিক আবেশ | ভালবাসা আর পূজার সুখস্মৃত মেলবন্ধন | যেখানে পার্থিবতা এবং ঐশ্বরীকতা ,নশ্বরতা আর অবিনশ্বরতা মিলে মিশে একাকার | বাঙালী জীবনে তাই জন্মদাত্রী মা-ই ঠাকুর দালানের মা দূর্গা,সর্ব্বজয়া | কখন-ও মা সারদা, কখন-ও বা মাদার টেরেসা | বাঙালী মানসে মা একান্ত আপন এক নিরাপদ আশ্রয় | তাইতো হৃদয়ের শ্রেষ্ঠ কবির কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে আমরা গেয়ে উঠি-
“আর আমি-যে কিছু চাহি নে, চরণতলে বসে থাকিব
আর আমি-যে কিছু চাহি নে, জননী ব’লে শুধু ডাকিব “ |
এ এক মৌলিক ভালবাসার উদাত্ত আর্তি যা তার স্বকীয় সার্বজনীনতায় রূপান্তরিত হয় এক মহোৎসবে, দূর্গোৎসবে। এই মহোৎসবের মহাপ্রাঙ্গনে সামিল হতে প্রস্তুত উত্তর-পূর্ব-ওহায়ো-বেঙ্গলী-এ্যাসোসিয়েশন্, এই শরতে | স-গৌরবে, স-উদ্যমে | অতি সদ্য আত্মপ্রকাশের স্ফুরিত আত্মবিশ্বাসে, নবদূর্গার বোধন দিয়ে দূর্গাপূজার উন্মোচন | আজকের এই রোপিত বীজের মধ্যে যে অঙ্কুর প্রচ্ছন্ন, আগামী তে তা-ই পুষ্পে-পত্রে-বর্ণে-গন্ধে সজ্জিত এক পরিণত বৃক্ষ হওয়ার অঙ্গীকার রাখে | মা-দূর্গার আশীর্বাদে তার সৃজন হয়ে উঠুক তরুণ,সতেজ,প্রাণোচ্ছল | আমাদের স্থির বিশ্বাস, তা সম্ভব হবে উত্তর-পূর্ব-ওহায়ো’র ক্রমবর্ধমান মানুষের অকুন্ঠ অনুপ্রেরণায়, তাঁদের সস্নেহ পৃষ্ঠপোষকতায় | একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর ঐকান্তিক প্রয়াসে |
এমন দিগন্তব্যাপী মহোৎসবে স্বাভাবিকভাবেই আসে সৃজনশীলতা, যা আমাদের সুস্থ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক | উত্তর-পূর্ব-ওহায়ো-বেঙ্গলী-এ্যাসোসিয়েশন্ সেই ঐতিহ্যবাহী সৃজনশৈলীর অমোঘ ধারা বহন করতে প্রস্তুত আবৃত্তি,নাটক,সঙ্গীত,নৃত্য ও আরও বিবিধ সাংস্কৃতিক মননশীলতার মধ্যে দিয়ে |
মা-দূর্গার আরাধনায় নৈবেদ্য-র পাশাপাশি যেমন ধুপ-ধুনো-চন্দন এর উপাচার থাকে, তেমনি সৃজনশীল পরিবেশনায় গান-নাচ-আবৃত্তি-নাটকের সঙ্গে থাকে গল্প-প্রবন্ধ-কবিতা-চিত্র | সেই উপাচার দিয়েই এক নতুন দিগন্তের দিশারী আমাদের বার্ষিক পত্রিকা ‘নবদিগন্ত’ , ক্লীভল্যান্ড বাসী সকল বাঙালীর সাহিত্য-সৃষ্টির এক অকুন্ঠ প্রয়াস | প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘সাহিত্য’ শব্দটির উৎপত্তি ‘সহিত’ শব্দটি থেকে যার এক অর্থ ‘হিতকর’ | সকলের সহিত থেকে হিতসাধন করাই ‘নবদিগন্ত’র মূলমন্ত্র | সর্বজন সমন্বয়ে সেই হিত-সাধনায় সাগ্রহে অংশ নিতে পেরে আমরা গর্বিত |
|| শুভ শারদীয়া ||
লেখক পরিচিতি
দীপঙ্কর ভৌমিক
দীপঙ্কর ভৌমিক কর্মসূত্রে পরিবার-সহ ওহায়োতে থাকেন। কাজের অবসরে ভ্রমণ, সঙ্গীত, লেখালেখি এবং বিভিন্ন সৃজনশীল চিন্তাভাবনা নিয়ে সময় কাটাতে পছন্দ করেন | নতুন স্থান ও সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা অর্জনের প্রতি দীপঙ্কর বিশেষ আগ্রহী | এছাড়া, তিনি বিভিন্ন ধরনের ও বিভিন্ন ঘরানার সঙ্গীতচর্চা করতে ভালোবাসেন | এই সম্পাদকীয়টি বিশেষভাবে নবদিগন্ত ২০২৫ পূজাবার্ষিকীর জন্য প্রবন্ধিত ।

