স্মৃতির আনাচে-কানাচে: আমার গ্রাম টাকি
“মানাই, তাড়াতাড়ি ওঠ মা, এখনই গাড়ি চলে আসবে—আজ যে ষষ্ঠী।”
মায়ের কথা শুনে তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। চোখ খুলেই মনে হলো, সকালটা কী মিষ্টি!
এই রে! পৌনে ছ’টা বাজে। তাড়াতাড়ি তৈরি হতে হবে—আজ যে সবাই মিলে টাকি যাব আমরা।
“সবাই” বলতে আমি, বোন, মা, বাবা, জ্যেঠু, বম্মা, দুই দিদি, দাদাভাই, আমার পিসিরা, কাকারা এবং তাদের পরিবার। এদের মধ্যে আমরা কয়েকজন রওনা হব আমাদের বাড়ি থেকে, বাকিরা আসবে বিভিন্ন জায়গা থেকে।
আমাদের বাড়ির জন্য বড় দুটো টাটা সুমো বুক করা হয়েছিল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। ইতিমধ্যেই বাকি সবাই গতকালই এসে উঠেছে আমাদের বাড়িতে।
কি ভাবছেন? মনে হচ্ছে নিশ্চয়ই আমি একটা টাটকা পূজোর দিনের ট্রাভেল ব্লগ লিখছি? না না, একদম তা নয়। আসলে লিখছি আজ থেকে প্রায় চব্বিশ বছর আগেকার কথা। আমি তখন দ্বিতীয় কি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। সেই সময় আমরা এভাবেই টাকি যেতাম, সবাই মিলে হৈ-হৈ করে। আজ আপনাদের শোনাবো আমার টাকির গল্প, আর এক প্রাচীন বনেদি বাড়ির ইতিহাস।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার এক ছোট্ট গ্রাম টাকি।
ইছামতি নদীর তীরে গড়ে ওঠা, সোনালি ধানক্ষেতের চাদরে মোড়া একখণ্ড ভূমি। টাকি সুন্দরবনের খুব কাছে অবস্থিত হওয়ায় এটি ভ্রমণপিপাসু মানুষদের একটি প্রিয় স্থান।
আমার পূর্বপুরুষরা টাকিতে আঠারো বিঘে জমির উপর একটি অট্টালিকা সদৃশ সাত-মহলা বাড়ি স্থাপন করেছিলেন। ঠাকুমার কাছে শুনেছিলাম, বাংলার দাঙ্গার সময় অনেক গরিব প্রজাকে এই বাড়ি আশ্রয় দিয়েছিল, আগলে রেখেছিল।
আমার দাদু ছিলেন এই পরিবারের চতুর্থ পুরুষ। তিনি স্বদেশ ব্রতে দীক্ষিত ছিলেন এবং নেতাজির সঙ্গে কলকাতার দমদম জেলে বন্দি ছিলেন।দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়, আর তাঁর সম্মানে একটি তাম্র ফলক বসানো হয়। এর বেশ কিছু বছর পর তিনি প্রয়াত হন। দাদুর মৃত্যুর পর টাকিতে তাঁর নামে সরণি তৈরি হয়, যা আজও গর্বের স্মৃতি বহন করছে।
আমার ঠাকুমা—যিনি ছিলেন কলকাতার নরেন্দ্রনাথ দত্ত (স্বামীজির) বংশের একজন বংশধর—যখন এই পরিবারে বউ হয়ে আসেন, তখন তিনি ছিলেন মাত্র সাত বছরের বালিকা।
রাতে শুতে ভয় পেতেন, তাই সমবয়সী মহিলারা একসাথে ঘুমোতেন আর দোরের বাইরে থাকত প্রহরা।ঠাকুমার মুখে শুনেছি তাঁদের জীবনযাত্রার কাহিনি।
আমার ঠাকুমার মতো বাকি সকল বউরাও ছিলেন বালিকা, তাই সবার মধ্যে ছিল সখ্যতা, খুনসুটি সম্পর্ক। এতগুলি বালিকাকে দেখাশোনার জন্য মাইনে করা লোক থাকত। তারা একসাথে খেলাধুলা করতেন, লেখাপড়াও।
ছেলেবেলায় আমরা সবাই একসাথে পূজোর সময় টাকিতে যেতাম। আমাদের বাড়িতে খুব বড় করে দ্বীপান্বিতা লক্ষ্মীপূজো, অর্থাৎ কালীপূজোর সময় লক্ষ্মীপূজো হতো। আমাদের পরিবারে মা লক্ষ্মী সরায় পূজিত হতেন। পাঁচটি সোনার গিনি, পাঁচটি রৌপ্য গিনি, পাঁচ কড়ি, মাটির পাত্র, ধান সহযোগে মায়ের পূজা করা হতো।
ছোটবেলায় পূজোর সময় দেখতাম, সারা গ্রাম ভেঙে পড়ত ঠাকুরদালানে। ধূপ-ধুনোর গন্ধে ম-ম করত খিলান, ঠাকুরদালান, গোটা বাড়ি।
আমাদের ছোটদের আনন্দ আর কে দেখে! খাবার স্থানে কে জল আর লবণ পরিবেশন করবে, তা নিয়ে লড়াই শুরু হতো।
অবশ্য সেই লড়াইতে যার বয়স সবচেয়ে কম, তার হার ছিল অবশ্যম্ভাবী।
আমাদের বাড়িতে সাতটা মহল। ঢুকতেই অলিন্দ, তারপর ছ’টা মহল, আর সব শেষে রান্নাবাড়ি ও ভিতরদালান—যেখানে একসাথে পঞ্চাশ জন মানুষ খেতেন।
বাড়ির পেছনে ছিল বিশাল পাঁচটা বাগান, তিনটে দিঘি আর পুকুর।
গরমকালে আমের সময় ভাইবোনেরা উতলা হয়ে থাকতাম আম কুড়ানোর জন্য। ছিপ দিয়ে দাদাদের সঙ্গে পুকুর থেকে কৈ, চিলাপোটা, চিংড়ি, রুই মাছ ধরতাম। স্মৃতির খাঁচায় সোনা রঙের দিনগুলি এমনি ছিলো । ধানের মরাইয়ে লুকোনো, বিশাল ঢেকিতে ধান ভাঙার বৃথা চেষ্টা করা, দাদাদের সঙ্গে মারামারি, দিদিদের সঙ্গে বেল মাখা খাওয়া, পিসির কাছে স্বামীজির নানা অজানা গল্প শোনা—(যা আমাদের বংশে লোকমুখে প্রচলিত ছিল।)
টাকিতে যখনি যেতাম আমরা বাড়ি ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই গরম ফুলকো লুচি, আলুর তরকারি আর মিষ্টি আসতো ,আর একটু পরেই মাছ ভাজা। আমরা রান্নাঘরে বারবার উঁকি মেরে দেখতাম
দুপুরে মা-কাকিমারা যখন একটু ঘুমোতেন, আমরা বাগানে যেতাম গুপ্তধনের খোঁজে। আর সেটা কিছুতেই পাওয়া যেত না।
পেয়ারা গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে আনতো দাদারা, আর আমরা খেতাম। অমুক দাদা কত বীর—এসব বলাবলি করতাম।
সেই দিনগুলো ছিল স্বপ্নের মতো।
সকালে বাবা , সব ভাইবোনকে নিয়ে যেতেন খেজুর রস খাওয়াতে। আমরা দেখতাম, গাছের গায়ে বাঁধা হাঁড়িতে খেজুরের রস পড়ছে।
খেজুর রস খেয়ে সবাই যেতাম ইছামতি নদীর চর দেখতে।
ইছামতি নদীর রূপালি জলে সোনার রোদ পড়ে চোখ ঝলসে দিত।
মাঝিরা তাদের নৌকা নিয়ে অনেক দূরে যেত মাছ ধরতে।
নদীর পাড়ে কিছু নৌকা বাঁধা থাকত, তারা মানুষজন পারাপার করত।
ইছামতি নদীর পাড়ে অনেক ইটভাটা গড়ে উঠেছিল। নদীর নরম মাটি ভাটার আগুনে পুড়িয়ে উৎকৃষ্ট মানের ইট তৈরি হতো।
নদীর আল ধরে হাঁটলে অনেক দূর পর্যন্ত চলে যাওয়া যেত। আমরা বাচ্চারা সবাই তাই করতাম।
সারা সকাল হুড়োহুড়ি করে কাটিয়ে বাবা যখন বাড়ি নিয়ে যেতেন, কেউ কিন্তু বকা খেত না। পূজোর দিনগুলোয় বকা খাওয়া থেকে ছাড় ছিল।
টাকিতে দু’টো কি তিনটে দুর্গাপূজা হতো বিভিন্ন ক্লাব থেকে।
তবে পূজার প্যান্ডেলে খুব বেশি আড়ম্বর দেখা যেত না। প্রতিমা, প্যান্ডেল, আলোকসজ্জা—সব হতো সাবেকি ধাঁচে।
তবু সেই পূজো দেখতে মানুষের ঢল নামত।
ঐ দেখো, ইতিহাসের অলিগলি দিয়ে অনেকটা পথ ঘুরে এলাম!
এবার ফেরা যাক।
বৃষ্টির সন্ধ্যায় বাড়ির অলিন্দে বসে মুড়ি, চা, সিঙাড়া সহযোগে ইছামতি নদীর গল্প শুনতে হবে তো।
টাকিতে ইছামতি নদীর বিসর্জন খুবই বিখ্যাত।
এই একদিন দুই বাংলার মানুষকে কাছাকাছি আসতে দেওয়া হয়।
সব বাধা সরিয়ে ভারত আর বাংলাদেশের মানুষ জলপথে এক হয় মাঝনদীতে।
সকলেই একে অপরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে, বিজয়াদশমীর শুভেচ্ছা জানায়।
এ এক অনন্য প্রথা, যা যুগ যুগ ধরে মানুষকে বোঝায়—ঈশ্বরের তৈরি পৃথিবীতে আমরা যতই নিজেদের দেশ-কাল-সীমানায় আলাদা রাখি, ঈশ্বরের কাছে আমাদের কোনো ভেদ নেই। আমরা সবাই এক।
টাকির খুব কাছে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলা অবস্থিত। টাকি থেকে বাসন্তী হয়ে ঘন্টা তিনেকের ভেতরে সুন্দরবন পৌঁছে যাওয়া যায়। ইছামতি নদীতে ভটভটী বা স্টীমারে করে সুন্দরবন ভ্রমন করা যায়। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে এই স্থানের মৎস উৎসব খুব বড় একটা উৎসব,বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ জড়ো হন। ইছামতির খুব জনপ্রিয় মাছ হল আমুদে মাছ,এছাড়া পাবদা, ট্যংরা, আড় সহ বিভিন্ন ছোট বড় মাছের বাজার বসে,তাছাড়া সুস্বাদু ভাজা মাছ তো আছেই । বলতেই হয় এই ধরনের উৎসব রসনাপ্রিয় বাঙালি কে সব সময় আকর্ষন করে।
কিছু জিনিস আজও একরকম আছে। তবুও আজ চব্বিশ টা বছর পার হয়ে গেছে। মহাকাল গ্রাস করেছে অনেক কিছু। আমার দাদু ঠাকুমা পরিবারের আরো অনেক প্রবীণ সদস্য একে একে মৃত্যু লোকে পাড়ি দিয়েছেন। ঠাকুর চাকরে গমগম করা সেই সুবিশাল সাতমহলা বাড়ি আজ প্রায় নির্জন। কড়ি কাঠের মধ্যে থেকে শুধু শান্ত দুপুরের হাহাকার শোনা যায়।
ছোটো ছেলেমেয়েরা আজ আর কেউ নেই,সবাই এখন প্রাপ্তবয়স্ক, দেশে বিদেশে বিভিন্ন স্থানে তারা রয়েছে। আর টাকিতে আমাদের বাড়িটা আজো তার ছোট্ট ছেলে মেয়েদের জন্য অপেক্ষা করছে,হয়তো সে কখনো তাদের পাবে,কিন্তু অন্য রূপে অন্য রং এ,একদল নতুন ঝলমলে হাসি মাখানো মুখের মধ্যে দিয়ে। আর সেই মুখগুলো লিখবে আর এক নতুন ইতিহাস।

অর্পিতা দত্ত
সময়ের নিজস্ব খেয়ালে পাড়ি দিয়ে অর্পিতা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওর বাসিন্দা। মনের কথা খুব সহজ, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে অনায়াসে লিখতে তিনি বরাবরই ভালোবাসেন। কলকাতার বিভা পাবলিকেশনের ভূত ভূতুম পূজাবার্ষিকী সংখ্যায় তার গল্প ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। আর স্মৃতির আনাচে-কানাচে প্রবন্ধে তিনি শৈশবের কিছু অমূল্য মুহূর্ত আমাদের জন্য উপহার হিসেবে তুলে ধরেছেন।

