|

পুরানো সেই দিনের কথা 

‘পুরানো সেই দিনের কথা’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটি সকলেরই জানা। এই গানের পঙক্তি গুলো  যখনই আমরা শুনি আমরা  হঠাৎ করে যেন উপলব্ধি করি যে আমরা কিছু শতাব্দী পেছনে  চলে গেছি।

পুরানো সেই দিনের কথা বলতে গেলে মনে পড়ে যায় ছোটবেলার সেই নিস্পাপ দিনগুলো,  আমার প্রিয় শহর কলকাতাতে কাটানো রঙিন ,  স্বপ্নময় দিন, কিছু বহু প্রতীক্ষিত  মুহূর্ত  এবং সর্বোপরি  প্রিয়জনদের সাথে কাটানো  কিছু বিশেষ  সময়। এগুলো এমনই স্মৃতি যা মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে খোদাই করা থাকে এবং সময়ের সাথে সাথে আরও মূল্যবান হয়ে ওঠে। এই মুহূর্তগুলোর কথা ভেবে কখনও বা আমরা আনন্দে নেচে উঠি অথবা গভীর বেদনায় মন কেঁদে উঠে।

আমার ছোটবেলা প্রাথমিক ভাবে কেটেছে সেন্ট্রাল কলকাতার শিয়ালদহ অঞ্চলে, সন্তোষ মিত্র স্কয়ারের পাশে এক জনবহুল পরিবেশে। আজও মনে পড়ে সেই পুজোর জাঁকজমক,   ‘ আহমেদাবাদ এক্সপ্রেসের’ মণ্ডপের ভিড়, ভোর হতে না হতে তীব্র মাইকে আগমনীর গান এবং তার মধ্যে হঠাৎ  ভেসে ওঠা  ‘সকল দর্শনার্থদের উদ্দেশ্যে জানাচ্ছি  শ্যাম সুন্দর বনিক আপনি যেখানেই থাকুন  না কেন আমাদের মঞ্চের সামনে চলে আসুন ‘ । এর পর তো আছেই পাড়ার আড্ডা, ঠাকুরের সন্ধ্যা আরতি,  ঠাকুমার সঙ্গে দেখা , এগ রোল আর ফুচকা খাওয়া আর বিজয় দশমীতে বড় ম্যাটাডোর চড়ে বিসর্জন প্রসেশন এ যাওয়া।

 আমি আমার জীবনের  খুব কম সময় কলকাতাতে কাটিয়েছি।   আমার ঠাকুমার সঙ্গে কাটানো কিছু স্মৃতি খুবই মূল্যবান। আমি আমার ঠাকুরমার হাত ধরে বর্ণের সঙ্গে পরিচিত হই। উনি আমাকে  বুদ্ধির অঙ্কো শেখাতেন, সব সময়  বাবার বকুনি থেকে রক্ষা করতেন এবং সর্বোপরি আমাকে জীবন অতিক্রম করতে কিছু মূলবান শিক্ষা দিয়েছিলেন যা আজও পথ চলতে  আমাকে খুব সাহায্য করে। মা চলে গেছেন প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেছে।  কিন্তু আজও মায়ের হাতে বানানো করাইশুটির  কচুরি, ঢোকার ডালনা আর চিকেন  পোলাও যেন চির অমর হয়ে রয়েছে। আমি প্রায়শই চেষ্টা করি মায়ের রেসিপি গুলো বানিয়ে ঐতিহ্য  বজায় রাখতে কিন্তু কোনো সময়ই আমি সেই নিপুণ স্বাদ আনতে পারি না।

 আমার মনে হয় সবার  জন্য আর এক সুখকর স্মৃতি  হলো কলেজের দিনগুলো। উচ্চ শিক্ষার জন্য আমাকে গুজরাত শহরে পাড়ি দিতে হয়। আর পাঁচ জনের মতো আমারও ওই  হোস্টেলের দিনগুলোর সুখকর স্মৃতি  আজও মনে জ্বলজ্বল  করছে। গুজরাট এ পড়ার দরুন আমার ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গার মানুষের সঙ্গে  পরিচয় ঘটে, তাদের সংস্কৃতি, খাদ্য , জীবনযাত্রার কথা জানতে পারি । অনেক মজাদার ঘটনার কথা মনে পড়ে । ইন্টারকোলেজ ফেস্ট, হোস্টেল পালিয়ে সিনেমা দেখা, প্রথম বার একসাথে রেসিপি বানানো, জন্মদিনের বিরল সারপ্রাইজ ইত্যাদি। কলেজের প্রথম বছরে আমার এক বাইক দুর্ঘটনা হয়।  সেই দুঃসময় আমার সব বন্ধুরা  ছায়ার মতো আমার পাশে ছিল, বাবা মায়ের অনুপস্থিতি একটুও বুঝতে দেই নি । বলা বাহুল্য আজ পর্যন্ত আমার বাবা মায়ের কাছে এই  দুর্ঘটনার কথা অজানা। হোস্টেল জীবন থেকে সত্যিই অনেক মূল্যবান শিক্ষা অর্জন করেছি যেমন ব্যক্তিত্ব গঠন, সামাজিক দক্ষতা এবং আত্মনির্ভর হওয়া।

 আমার শৈশবের দিনগুলো আবার যেন তাজা করে দেই আমার মেয়ে অস্মিতা। ওর খেলার পদ্ধতি, দুষ্টুমি, উল্লাস, পড়া না পেরে বিচিত্র কিছু  অজুহাত দেওয়া যেন অদ্ভুত ভাবে আমার সঙ্গে মিলে যায়। মনে পড়ে যায় বাবার বকুনি  তারপরই কোলে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে  দেওয়া। 

যদিও আমরা আজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অনেক আধুনিক এবং যান্ত্রিক কিন্তু কোথাও যেন আজও আমি শিয়ালদহর চিলেকোঠায় বন্দী। ‘ভরা থাক ভরা থাক স্মৃতি শুধাই বিদায় পাত্রখানি’। রবি ঠাকুরের এই পংক্তি দিয়ে ইতি টানলাম। সময়ের  বিবর্তনে জীবনে অনেক পরিবর্তন আসে কিন্তু সেই পুরাতন মুহূর্তগুলি মনের মণিকোঠায় স্বর্ণাক্ষরে রেখাপাত করে এবং চিরকালের জন্য অমর হয়ে থেকে যায়।



ভাস্বতী  দাস

ভাস্বতী দাস, স্ট্রংসভিলের নিবাসী, গান আর রচনার মধ্য দিয়ে জীবনের সৌন্দর্য ও অনুভূতি ব্যক্ত করতে ভালোবাসেন।

ADVERTISEMENT
300 x 200 diff color
A11

Similar Posts

Leave a Reply